যে গ্রামটি ছিল আমার প্রাণের নাম: শরীয়তপুর জেলার, আংগারিয়া ইউনিয়ন এর সিংগারিয়া আমাদের গ্রাম।
এক সময় আমার গ্রাম সিংগারিয়া ছিল জীবনের এক নির্ভেজাল প্রতিচ্ছবি। চারদিকে বিস্তৃত সবুজ মাঠ, ঋতু বদলের সাথে বদলে যাওয়া ফসলের রঙ, খালের শান্ত প্রবাহ, পুকুর ভরা স্বচ্ছ পানি আর সকাল-বিকেল গরু-ছাগল চরানোর দৃশ্য, কৃষক যেত হাল চাষ করতে তার গরু নিয়ে এসবই ছিল আমাদের নিত্যদিনের চেনা ছবি। গ্রাম তখন শুধু বসবাসের জায়গা নয়, ছিল মানুষের শ্রম, সম্পর্ক ও প্রকৃতির এক গভীর সহাবস্থান।
শৈশবে দেখা সেই গ্রামে কৃষক তার জমিতে ফসল ফলাত, দিনমজুর তার কাজ পেত, রাখাল মাঠে পশু চরাত, আর প্রকৃতি তার নিজস্ব ছন্দে আমাদের জীবনকে আগলে রাখত। খালগুলো ছিল পানির স্বাভাবিক পথ, পুকুরগুলো ছিল জীবনের ভরসা, বন-জঙ্গল ছিল পরিবেশের নীরব রক্ষাকবচ। গ্রাম তখন কারও একার ছিল না-গ্রাম ছিল সবার।
কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই চেনা গ্রামের চেহারা আজ আর আগের মতো নেই। পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু সেই পরিবর্তন সকলের কল্যাণ বয়ে আনেনি। ধীরে ধীরে গ্রাম তার প্রাণ হারাতে শুরু করেছে। যে পরিবর্তন উন্নয়নের নামে এসেছে, তা অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃতি, পরিবেশ, কৃষি ও মানুষের জীবনের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আজ দাঁড়িয়ে শৈশবের সেই গ্রামের কথা ভাবলে মনে হয়, আমরা যেন নীরবে এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস হারাতে বসেছি।
এই লেখা কোনো অভিযোগের দলিল নয়, কোনো পক্ষের বিপক্ষে দাঁড়ানোর প্রয়াসও নয়। এটি একটি গ্রামের হারিয়ে যেতে থাকা জীবনের নীরব সাক্ষ্য-যা বলা প্রয়োজন, সংযমের সাথে, দায়িত্ববোধ নিয়ে।
হারিয়ে যাওয়া নীরব প্রশ্ন:
গ্রাম যেহেতু আমাদের সকলের, তাই অতীতের চিত্র অনেকেরই মনে থাকার কথা। এক সময় হুড়ার বাজার থেকে নয়াকান্দি পর্যন্ত বিস্তৃত একটি খাল ছিল, যা গ্রামের পানিপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করত। সিংগারিয়া গণ কবরস্থানের দক্ষিণ–পশ্চিম দিক দিয়ে তুলাতলা বাজারের সাথে যুক্ত আরেকটি খাল ছিল। উত্তর–পূর্ব দিকে খান বাড়ি, মল্লিক বাড়ি ও সরদার বাড়ি ঘেঁষে প্রবাহিত ছিল একটি খাল, যা বর্ষাকালে পানিনিষ্কাশনে সহায়ক ভূমিকা রাখত।
এছাড়াও মহন সরদার স্কুল থেকে তৎকালীন হুড়ার বাজার হয়ে পলপাড় (ছাগলখার) পর্যন্ত একটি খাল ছিল, ‘চক’-এর পানি নামার জন্য পরিচিত একটি ছোট খাল ছিল, জ্বীনতলা দিয়ে প্রবাহিত আরেকটি খাল ছিল। এর বাইরে ছোট–বড় আরও বহু নালার মতো খাল ছিল, যেগুলো একসাথে গ্রামের প্রাকৃতিক পানি ব্যবস্থাকে সচল রাখত। এসবই চোখে দেখা, জীবনে অনুভব করা বাস্তবতা।

আজ প্রশ্ন জাগে—বর্তমান সময়ে আমাদের গ্রামে আসলে কয়টি খাল অবশিষ্ট আছে? কেন এই খালগুলো হারিয়ে গেল, কীভাবে সেগুলো ভরাট হলো—এই প্রশ্নগুলোর কোনো সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য উত্তর যেন কারও কাছেই নেই। পরিবর্তনটি ঘটেছে নীরবে, কিন্তু এর প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এর ফল আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি। গ্রামের বহু পুকুরে আর আগের মতো পানি থাকে না। পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় প্রায় প্রতিটি বাড়িতে এখন টিউবওয়েলের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এই বাস্তবতায় একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—যদি কোনো বাড়িতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তখন পর্যাপ্ত পানির অভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা আদৌ সম্ভব হবে কি না।
এই প্রশ্ন কোনো আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নয়। বরং এটি আমাদের বর্তমান অবস্থার প্রতি একটি দায়িত্বশীল দৃষ্টিপাত। কারণ পানির সংকট শুধু কৃষি বা দৈনন্দিন ব্যবহারের বিষয় নয়; এটি সরাসরি মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনের সাথে সম্পর্কিত।
সাম্প্রতিক সময়ে আমার গ্রামে একের পর এক মাছ চাষের ঘের তৈরি হচ্ছে। এর ফলে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষ অনেক জায়গায় কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জমির স্বাভাবিক উঁচু–নিচু কাঠামো পরিবর্তিত হওয়ায় একবার ঘের তৈরি হলে সেই জমি আবার কৃষিকাজে ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
এই পরিস্থিতিতে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে তাদের জমি ঘেরের আওতায় দিতে রাজি হচ্ছেন। কারণ, ইতোমধ্যে যেসব ঘের তৈরি হয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই পরিকল্পিত ভূমি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে নয়; বরং ব্যক্তিগত স্বার্থে, অনেক ক্ষেত্রে নিয়মনীতি ও সামগ্রিক প্রভাব বিবেচনা না করেই গড়ে উঠেছে। ফলে আশপাশের জমিও স্বাভাবিক কৃষিকাজের জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
ঘের মালিকদের পক্ষ থেকে সাধারণত একটি যুক্তিই সামনে আসে—প্রতি শতাংশ জমির জন্য বছরে নির্দিষ্ট হারে অর্থ প্রদান করা হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে ২০০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে। যুক্তিটি সহজভাবে উপস্থাপন করা হয়: “জমি চাষ করে যে পরিমাণ ধান পাবেন, তার চেয়ে বেশি অর্থ এখানে দেওয়া হচ্ছে।” আপাতদৃষ্টিতে এটি লাভজনক মনে হতে পারে।
কিন্তু এই হিসাবটি কেবল জমির মালিকানাভিত্তিক, সামগ্রিক জীবিকা ও অর্থনৈতিক চক্রের কথা এতে অনুপস্থিত। একটি ফসল চাষের সাথে শুধু একজন জমি মালিকের লাভ–লোকসান জড়িত নয়; জড়িত থাকে বহু মানুষের জীবন ও কর্মসংস্থান।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, কারও ১০ কড়া জমিতে ধান চাষ করা হলো। এই একটি ফসলের সাথে যে জীবিকা চক্র গড়ে ওঠে, তা সংক্ষেপে এমন—
১. ধানের বীজ প্রস্তুত ও রোপণ
২. জমি আগাছামুক্ত করা
৩. ট্রিলার বা লাঙল দিয়ে চাষ দেওয়া
৪. জমি সমতল ও প্রস্তুত করা
৫. ধান রোপণ
৬. সার ও অন্যান্য উপকরণ প্রয়োগ
৭. দুই থেকে তিন দফা আগাছা পরিষ্কার
৮. ধান কাটা
৯. ধান মাড়াই, বহন ও বোলক মালিকসহ সংশ্লিষ্ট শ্রম
এই প্রতিটি ধাপে মানুষের শ্রম প্রয়োজন হয়। প্রতিটি ধাপে টাকা হাত বদল হয়। দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, যন্ত্রচালক, ব্যবসায়ী—অনেকের জীবিকা এখানে যুক্ত থাকে। এর পাশাপাশি ক্ষেতের চারপাশে পোকামাকড়, পাখি, জলজ প্রাণীসহ জীববৈচিত্র্য টিকে থাকে, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
ঘেরভিত্তিক ব্যবস্থায় এই বহুমাত্রিক জীবিকা চক্রটি সংকুচিত হয়ে যায়। এককালীন বা নির্দিষ্ট হারে পাওয়া অর্থ হয়তো তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি গ্রামের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ—তিনটির জন্যই ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন থেকে যায়—জমির মালিক যে অর্থ আজ পাচ্ছেন, তা কি সত্যিই একটি ফসলভিত্তিক জীবিকা ব্যবস্থার সামগ্রিক লাভের সমান বা তার চেয়ে বেশি? বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত লাভের হিসাব দিয়ে নয়, গ্রাম ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির বাস্তবতা:
গ্রামের জমি ও পানির স্বাভাবিক ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন ঘটছে, তার প্রভাব শুধু বর্তমান সময়েই নয়—ভবিষ্যতের জন্যও নানামুখী ঝুঁকি তৈরি করছে। ফসলি জমিকে অপরিকল্পিতভাবে ঘেরভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করার ফলে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও জটিল পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।
প্রথমত, পানি ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। খাল, পুকুর ও জলাভূমি কমে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সুযোগ হ্রাস পাচ্ছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে। এর পরিণতিতে গ্রামবাসীকে বাড়তি খরচ ও ঝুঁকি নিয়ে টিউবওয়েলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই পানিসংকট আরও তীব্র হলে দৈনন্দিন জীবন ও জরুরি পরিস্থিতিতে, যেমন অগ্নিকাণ্ডের সময়, মানুষের নিরাপত্তা বড় প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, জমির মালিকানা ও ব্যবহার সংক্রান্ত ঝুঁকিও কম নয়। একবার কোনো জমি ঘেরের আওতায় চলে গেলে তা আবার কৃষিকাজে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে জমির মালিক যদি ভবিষ্যতে জমি বিক্রয় করতে চান, তাহলে বাস্তবতা হলো—অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই জমি ঘের সংশ্লিষ্ট মালিকদের কাছেই বিক্রয় করতে হয়। এতে বাজারে জমির স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা থাকে না, ফলে জমির প্রকৃত মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।
তৃতীয়ত, এই ধরনের জমি অনেক সময় সাধারণ কৃষি জমির মতো সহজে বন্ধক রাখা বা কট দেওয়ার উপযোগী থাকে না। আর্থিক প্রয়োজনে কৃষক যখন তার জমিকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করতে চান, তখন নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়। এতে কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভবিষ্যতে সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা কমে যায়।
চতুর্থত, ঘেরভিত্তিক ব্যবস্থার বিস্তার গ্রামের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকেও একমুখী করে তুলছে। জমির ব্যবহার যখন একটি নির্দিষ্ট খাতে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তখন বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়। এতে গ্রাম ধীরে ধীরে বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবিকা হারিয়ে একটি ঝুঁকিপূর্ণ নির্ভরশীল ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যায়।
পঞ্চমত, পরিবেশগত ঝুঁকির দিকটিও গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। ফসলি জমি, খাল ও জলাশয় ঘিরে যে জীববৈচিত্র্য গড়ে উঠেছিল—পাখি, কীটপতঙ্গ, জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ—সেগুলোর আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। এর প্রভাব খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর পড়ছে, যা ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশের স্থিতিশীলতাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।

সব মিলিয়ে এসব ঝুঁকি তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান নাও হতে পারে, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এগুলো আরও গভীর ও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই বিষয়টি কেবল বর্তমান সুবিধা বা স্বল্পমেয়াদি লাভের প্রশ্ন নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, বাসযোগ্য ও স্বনির্ভর গ্রাম রেখে যাওয়ার প্রশ্ন।
এই আলোচনা কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে নয়। বরং আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে সচেতনভাবে ভাবার একটি প্রয়াস—যাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমরা এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলো বিবেচনায় নিতে পারি।
ভয়, নীরবতা ও প্রতিবাদের সংকট
গ্রামের এই পরিবর্তনগুলোর সবচেয়ে গভীর ও জটিল দিকটি হয়তো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু তা অত্যন্ত বাস্তব—ভয় ও নীরবতা। অনেক মানুষ পরিবর্তনগুলো দেখছেন, প্রভাব অনুভব করছেন, কিন্তু প্রকাশ্যে কথা বলছেন না। এটি সাহসের অভাব নয়; বরং সামাজিক বাস্তবতার একটি প্রতিফলন।
গ্রামের সমাজ কাঠামোতে পারস্পরিক সম্পর্ক, নির্ভরশীলতা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। কেউ জমির মালিক, কেউ দিনমজুর, কেউ আবার অন্যের জমিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই সম্পর্ক গুলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে অনেকেই আশঙ্কা করেন—কথা বললে হয়তো সামাজিক দূরত্ব তৈরি হবে, কাজের সুযোগ কমে যাবে, কিংবা অপ্রত্যাশিত জটিলতার মুখে পড়তে হবে।
এছাড়াও একটি মানসিক চাপ কাজ করে—“একজন কথা বলে কী হবে?” এই ভাবনা মানুষকে আরও নীরব করে তোলে। যখন কোনো পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং সেটি যেন স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তখন প্রতিবাদ করার মানসিক শক্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, অনেকেই বিষয়টিকে ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখছেন, সামাজিক সমস্যা হিসেবে নয়। কেউ ভাবছেন, নিজের জমি না থাকলে বা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলে কথা বলার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো গ্রামকে গ্রাস করে—কর্মসংস্থান, পানি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্নে।
এই নীরবতা কোনো অপরাধ নয়, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির পথ তৈরি করে। কারণ যখন সমস্যাগুলো আলোচনায় আসে না, তখন সমাধানের সুযোগও তৈরি হয় না। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি কিংবা সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও অনেক সময় বিষয়টির গভীরতা বুঝে ওঠার সুযোগ পান না।
এই প্রেক্ষাপটে প্রতিবাদ মানে উত্তেজনা সৃষ্টি করা নয়, সংঘাত তৈরি করা নয়। প্রতিবাদ মানে প্রশ্ন তোলা, আলোচনা করা, তথ্যভিত্তিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরা। ভয়ের জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে দায়িত্বশীল ভাষায় কথা বলা—এটাই এই সময়ের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
এই লেখা সেই নীরবতার ভাঙনের একটি বিনীত প্রয়াস মাত্র। কাউকে দোষারোপ করার জন্য নয়, বরং আমার প্রাণের গ্রাম যেন তার অস্তিত্ব, পরিবেশ ও জীবিকার ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে—সেই আশায়।
নিরপেক্ষ অবস্থান ও দায়িত্বশীল আহ্বান
এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। এটি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্যও নয়। এটি একটি গ্রামের বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্বশীলভাবে ভাবার একটি প্রয়াস মাত্র। গ্রাম যেমন একক কারও নয়, তেমনি এর সমস্যা ও সম্ভাবনাও সবার।
এই বাস্তবতায় প্রয়োজন সম্মিলিত ও সংযত দৃষ্টিভঙ্গি। ভূমি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পরিবেশ ও পানিসম্পদের বিষয়গুলো শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিলে তার প্রভাব পড়ে পুরো সমাজের ওপর। তাই এসব বিষয়ে আইন, পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এখানে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের প্রতি বিনীত আহ্বান—গ্রামের ফসলি জমি, খাল ও জলাভূমির বর্তমান অবস্থা গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করা হোক। কোথায় কীভাবে পরিবর্তন হচ্ছে, তা স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট তৈরি না হয়।
একইসাথে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, সমাজকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের প্রতি অনুরোধ—এই বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা উৎসাহিত করুন। ভয় বা বিভ্রান্তির বদলে সচেতনতা তৈরি হলে সমাধানের পথও সহজ হয়।
গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানেও গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বশীল প্রতিবেদনের মাধ্যমে গ্রাম, কৃষি ও পরিবেশসংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনায় এলে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ বাস্তবতা বুঝতে পারেন এবং সমন্বিত উদ্যোগের সুযোগ তৈরি হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সাধারণ মানুষের ভূমিকা। প্রশ্ন করা, মত প্রকাশ করা এবং আলোচনায় অংশ নেওয়া কোনো অপরাধ নয়। শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত উপায়ে নিজেদের উদ্বেগ জানানোই একটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ।
এই লেখা তাই কোনো শেষ কথা নয়; এটি একটি শুরু। যাতে করে গ্রাম তার কৃষি, পরিবেশ ও জীবনের স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন এমন একটি গ্রাম পায়, যেখানে উন্নয়ন ও প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক হয়ে এগিয়ে চলে—এই প্রত্যাশাই এখানে ব্যক্ত করা হলো।
লেখক:
মোঃ সালাউদ্দিন
মানবাধিকার কর্মী